উপজাতির সংজ্ঞা ও বাংলাদেশে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনধারাতে যে পরিবর্তন এসেছে তার কারণসমূহ আলোচনা
ভূমিকা: সামাজিক নৃবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত প্রতায় হলো ট্রাইব বা উপজাতি-গোষ্ঠী। বিশ্বের প্রায় সবদেশেই উপজাতি গোষ্ঠীর উপস্থিতি কমবেশি লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশেরও মোট জনসংখ্যার ১.৮ ভাগ উপজাতি। এদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। মোট উপজাতি সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৪৫টি। আর উপজাতি হচ্ছে এমন একটি গোষ্ঠী যেখানে অসংখ্য কৌমগোষ্ঠী, জাতিগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র অন্তজগোষ্ঠীর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।
উপজাতির সংজ্ঞা:
উপজাতি বলতে এমন একটি জনসমষ্টি বা সামাজিক গোষ্ঠীভুক্ত দলকে বোঝায়, যাদের রয়েছে একটি নিজস্ব বিশেষ ভাষা এবং সংস্কৃতি। সকল উপজাতীয় সমাজ অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত নয়।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
উপজাতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো-
ড. খুরশীদ আলম সাগর বলেন, "মানবধারার যেই অংশ আজো নিজেদেরকেই একই পুরুষের উত্তরাধিকার মনে করে এবং যারা আধুনিক শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্যচর্চা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিমন্ডলে থেকে অনেক দূরে রয়েছে, তাদেরকে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক টেইলর বলেন, "উপজাতি বলতে বোঝায় এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা মোটামুটিভাবে একটি অঞ্চলে সংগঠিত এই তাদের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং যার সদস্যরা মনে না যে তারা একই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের আওতাভুক্ত।
উপজাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানী কোহেন ও ইয়ামস বলেন, উপজাতি বলতে এমন এক জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা তাদের জীবিকার জন্য খাদ্য সংগ্রহ, উদ্যান, কৃষি ও পশুপালনের উপর নির্ভর।
সমাজবিজ্ঞানী EA Hostel-এর মতে, "উপজাতি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গোষ্ঠী, যারা একটি বিশেষ ভাষায় কথা বলে এবং বিশেষ সংস্কৃতির অংশীদার, যা তাদের অন্য জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক করে রাখে। তবে এরা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত নয়।
বোগারডাসের মতে, "উপজাতি-গোষ্ঠী রক্তের সম্পর্ক ও অভিন্ন ধর্মের উপর নির্ভরশীল।"
নৃবিজ্ঞানী রিভার্স (Revers) বলেন, "উপজাতি হচ্ছে একটি সরল প্রকৃতির সামাজিক গোষ্ঠী, যার সদস্যরা একই ভাষায় কথা বলে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য সমরূপী জীবনসংগ্রামে যৌথভাবে কাজ করে।"
উইলিয়াম জে.পেরি (William J.Perry)-এর ভাষায়, 'উপজাতি হচ্ছে এমন মানবগোষ্ঠী যারা একই সাথে বসবাস করে এবং একই ভাষায় কথা বলে।"
বাংলাদেশের উপজাতি-গোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তনের কারণসমূহ
কোনো সমাজ ও সভ্যতাতে আপনা-আপনি পরিবর্তন আসে না। বরং প্রতিটি পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তেমনি আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি-গোষ্ঠীর জীবনধারাতে পরিবর্তনের যে সূত্রপাত হয়েছে, তার পিছনেও কিছু উপাদান ক্রিয়াশীল অর্থাৎ কিছু কারণ বিদ্যমান আছে। বাংলাদেশের উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনপ্রণালিতে পরিবর্তনের কারণসমূহ নিম্নে তুলে ধর হালা-
১ শিক্ষার প্রসার:
আমাদের দেশে বসবাসরত উপজাতি গোষ্ঠীর নতুন প্রজন্ম অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকহারে বিদ্যালয়ে গমন করছে। পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার বর্তমানে বেশি। উপজাতি গোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে উপজাতিদের জন্য বিশেষ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা উপজাতি গোষ্ঠেীদেরকে অধিক হারে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে। ফলশ্রুতিতে উপজাতি গোষ্ঠীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটছে। আর উপজাতি জনগোষ্ঠীর এ শিক্ষিত অংশ উপজাতি সমাজের পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
২. এনজিওদের কার্যক্রম:
বাংলাদেশের উপজাতি-গোষ্ঠীর দুরবস্থা দূরীকরণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সাম্বা (NGO) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব NGO-এর বিভিন্ন ও বহুমুখী কল্যাণমূলক কার্যক্রম উপজাতি-গোষ্ঠীর জীকণধারাতে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।
৩. আত্মসচেতনতা তৈরি:
উন্নতির জন্য আগে চাই নিজের হীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা অর্জন অর্থাৎ আত্মসচেতনতা ছাড়া উন্নতি বা পরিবর্তন কোনোটাই আশা করা যায় না। আর শিক্ষার প্রসার উপজাতি-গোষ্ঠীর একটা অংশের মধ্যে আত্মসচেতনতার বীজ বপন করতে পেরেছে। এ আত্মসচেতনয়া অংশ ঐ সমাজের পরবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।।
৪. শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রভাব:
শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ব্যাপকতার যে প্রভাব তার ছোয়া উপজাতি সমাজেও কম বেশি গিয়ে পড়েছে।
৫. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি:
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি সমাজ ও সভ্যতাকে যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তেমনি উপজাতি সমাজেও সে পরিবর্তনেয় ছোঁয়া লেগেছে। যেমন- উপজাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা আনেকে ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছে।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উপজাতি-গোষ্ঠী হলো যে কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার সেই আংশ যারা স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি তথ্য জীবনপ্রণালির চর্চা করে আর ঐতিহ্যবাহী রীতি-নীতি, প্রথা-আচার হলো ঐ সমাজের। চালিকাশক্তি। এছাড়া উল্লিখিত কারণসমূহের দরুনই উপজাতি জীবনপ্রণালিতে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটেছে একথা অনস্বীকার্য।

No comments:
Post a Comment